শিরোনাম
আমাদের ডেস্ক : | ০৮:০৯ পিএম, ২০২৬-১০-১০
কক্সবাজারের উপকূল দিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় মানব পাচারকারী চক্র আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। টেকনাফ ও উখিয়ার পাশাপাশি জেলার কয়েকটি উপকূলীয় এলাকায় দালালদের তৎপরতার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পুরুষদের কাজের প্রলোভন এবং রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের বিয়ের আশ্বাস দিয়ে পাচারের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। কেউ জীবিকার সন্ধানে সমুদ্রযাত্রায় বেরিয়ে পড়ছেন, আবার কেউ মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর জিম্মি ও মুক্তিপণ আদায়ের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা। বছরের পর বছর নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় দিন কাটছে অনেক পরিবারের।
সর্বশেষ গত ৩০ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে সেন্টমার্টিন ও আশপাশের সমুদ্র এলাকায় টহলের সময় নৌবাহিনীর জাহাজ বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদ ১৬ জন রোহিঙ্গা ও ৪৯ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে। তাঁদের মধ্যে চারজন রোহিঙ্গা নারী ছিলেন। এ ঘটনায় আটজন রোহিঙ্গা ও তিনজন বাংলাদেশিসহ ১১ জনকে আটক করা হয়।
এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে টেকনাফের বাহারছড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে নারী-পুরুষসহ ১৮ জনকে উদ্ধার করে পুলিশ ও কোস্টগার্ড। তাঁদের মধ্যে দুজন রোহিঙ্গা ও ১৬ জন বাংলাদেশি। পুলিশ জানায়, মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁদের সেখানে জড়ো করা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতির খবর পেয়ে পাচারকারীরা পালিয়ে যায়। সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় উপকূলীয় এলাকায় লোকজনকে জড়ো করে সমুদ্রপথে পাঠানোর প্রস্তুতি চলার অভিযোগ সামনে এসেছে।
ছোট নৌকা থেকে বড় ট্রলারে
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পাচারকারীরা সাধারণত এক জায়গায় সবাইকে জড়ো করে না। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির ও স্থানীয় গ্রাম থেকে ছোট ছোট দলে সম্ভাব্য যাত্রীদের সংগ্রহ করা হয়। পরে তাঁদের টেকনাফের দুর্গম উপকূলীয় এলাকায় নেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, রাতে ছোট মাছ ধরার নৌকায় করে তাঁদের গভীর সমুদ্রে অপেক্ষমাণ বড় ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়। এ কাজে টেকনাফের বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া, মারিশবনিয়া ও নোয়াখালীপাড়া এবং উখিয়ার জালিয়াপালং, মনখালী ও ইনানীসহ কয়েকটি উপকূলীয় এলাকার নাম জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পাচারকারীদের লক্ষ্য শুধু বাংলাদেশি তরুণেরা নন; রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষদেরও এ চক্রের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে পাচারের অভিযোগ উঠেছে।
মালয়েশিয়ায় পৌঁছেই বদলে যায় পরিস্থিতি
পাচারের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেকের পরিস্থিতি বদলে যায়। তাঁদের কাউকে কাউকে চক্রের সদস্যরা জিম্মি করে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
রামুর খুনিয়াপালং এলাকার তরুণ কাজলের পরিবারের অভিযোগ, কাজলসহ তিন তরুণকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পর একটি চক্র তাঁদের আটক করে। প্রত্যেকের পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা করে দাবি করা হয়। পরিবারের সদস্যরা গবাদিপশু বিক্রি, জমি বন্ধক ও চাঁদা তুলে চার লাখ টাকার বেশি জোগাড় করে স্থানীয় এক দালালের হাতে দেন। পরিবারের দাবি, ওই টাকা নির্যাতনকারীদের কাছে পৌঁছানো হয়নি। পরে নির্যাতনের একপর্যায়ে কাজল মারা যান। তাঁর এক সহযাত্রী মালয়েশিয়ার কারাগারে রয়েছেন এবং অন্যজন দেশে ফেরার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছে পরিবার। কাজলের মা বলেন, ‘আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই। আমার সব শেষ হয়ে গেছে।’বাহারছড়ার ৮০ বছর বয়সী ছুরা খাতুনের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ। ১৫ বছর আগে তাঁর ছেলে আলী এক দালালের মাধ্যমে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর আর ফেরেননি। তিন ছেলে ও স্ত্রী রেখে জীবিকার সন্ধানে দেশ ছেড়েছিলেন আলী। এরপর থেকে তাঁর ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা জানতে পারেনি পরিবার।
বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে রোহিঙ্গা নারী পাচারের অভিযোগ রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের কয়েকজন মাঝির ভাষ্য, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা পুরুষদের মধ্যে বিয়ের জন্য নারী খোঁজার প্রবণতাকে কাজে লাগাচ্ছে পাচারকারীরা। এ জন্য আশ্রয়শিবিরে গিয়ে নারীদের বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, কোনো পরিবার রাজি হলে কয়েক দফা যোগাযোগের পর দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। এরপর নারী ও কিশোরীদের ছোট দলে উপকূলীয় এলাকায় এনে নৌকায় তুলে দেওয়া হয়। তবে বিয়ের প্রস্তাবের আড়ালে কতজন নারী ও কিশোরী পাচারের শিকার হয়েছেন, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
১৫ বছরেও নিখোঁজদের হিসাব নেই
সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় মানব পাচারের ঘটনা নতুন নয়। ২০১১ সাল থেকেই এ পথে মানুষের যাওয়ার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। ২০১৫ সালে থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী জঙ্গলে পাচারকারীদের ক্যাম্প ও গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই পথে মানব পাচারের ভয়াবহতা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসে।
পরবর্তী সময়ে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করায় কিছু সময়ের জন্য এ পথে তৎপরতা কমে আসে। তবে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর কক্সবাজার উপকূলকে কেন্দ্র করে পাচারচক্র নতুন করে সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বর্ষা শেষে সমুদ্র তুলনামূলক শান্ত হলে এ তৎপরতা বাড়ার আশঙ্কা থাকে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
গ্রেপ্তার হচ্ছে, মূল হোতারা অধরা
স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার করলেও চক্রের মূল সংগঠকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হচ্ছে। গ্রেপ্তার হওয়া কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে আবার একই কাজে যুক্ত হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির থেকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের চেষ্টা করছে দালাল চক্র। সীমান্ত ও উপকূলীয় এলাকায় বিজিবির নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, মানব পাচার ও অপহরণের বিরুদ্ধে পুলিশ সতর্ক রয়েছে এবং নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, সমুদ্রপথে মানব পাচার দেশের ভাবমূর্তি ও বৈধ শ্রমবাজার—দুই ক্ষেত্রেই ক্ষতি করছে।
তাঁর মতে, শুধু পাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দেশে ও বিদেশে থাকা পাচারচক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাঁদের অবৈধ সম্পদ জব্দ করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।
সমুদ্রপথে মানব পাচার ঠেকাতে তাই উপকূল পাহারা দেওয়ার পাশাপাশি দালাল নিয়োগকারী, অর্থদাতা, নৌযান নিয়ন্ত্রণকারী এবং দেশের বাইরে থাকা চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করা জরুরি। পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে না পারলে জীবিকার আশায় সমুদ্রযাত্রায় বের হওয়া মানুষের জিম্মি, নির্যাতন ও নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
-- মনছুর আলম মুন্না, স্টাফ রিপোর্টার
আমাদের ডেস্ক : : কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত এখন যেন মাদকের হটস্পট। এই দুই উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের এমন কোনো à¦...বিস্তারিত
পেকুয়া প্রতিনিধি :: : নূর মোহাম্মদ, পেকুয়া: কক্সবাজারের পেকুয়ায় চার শতক বসতভিটার জায়গা জবরদখলকে কেন্দ্র করে সৌদি প্রবà¦...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : কক্সবাজারের চকরিয়ায় কোস্ট গার্ডের অভিযানে ৫ টি দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদসহ ৩ জন সন্ত্রাসী ...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : টেকনাফে ১৬ এপিবিএন ও টেকনাফ থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে অপহৃত চারজন ভিকটিমকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় ...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : ভ্রমণের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হলো বিষাদে। বান্দরবানের থানচি উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র তিন্দু মুখ এà¦...বিস্তারিত
টেকনাফ প্রতিনিধি : : সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর সময় একটি ঝুঁকিপূর্ণ বোট থেকে ৭৬ জনকে উদ্ধার করেছে বাংলাদেà...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Coxsbazar | Developed By Muktodhara Technology Limited