চট্টগ্রাম   বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬  

শিরোনাম

এক দেহের উপমা

আনোয়ার হোসেন

ইসলাম ডেস্ক:    |    ০৯:১৯ পিএম, ২০২৬-০৮-৩১

এক দেহের উপমা

একটি দেহ। হাত, পা, চোখ, কান, হৃদপিণ্ড, ফুসফুস  সব আলাদা অঙ্গ। কাজও আলাদা। কিন্তু অনুভূতি এক। পায়ে কাঁটা ফুটলে শুধু পা কাঁদে না, সারা শরীর জেগে ওঠে। জ্বর আসে, ঘুম হারাম হয়, মাথা ভাবে কিভাবে ব্যথা কমানো যায়।

রাসূলুল্লাহ সা. ঠিক এই উপমা দিয়েই বুঝিয়েছেন মুসলিম উম্মাহ কেমন হবে। বিচ্ছিন্ন কিছু মানুষের সমষ্টি নয়, বরং একটা জীবন্ত দেহ।

হাদিসের নির্দেশনা:
রাসূল সা. ইরশাদ করেন- "মুমিনদের দৃষ্টান্ত তাদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে একটি দেহের মতো। যখন দেহের কোনো অঙ্গ অসুস্থ হয়, তখন সারা দেহ জ্বর ও অনিদ্রায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে।" (সহিহ মুসলিম:২৫৮৬)
এখানে তিনটি খুব গুরুত্বপূর্ণ  তিনটি বিষয় প্রতিয়মান হয় যে- ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতি। একটি মুসলিম সমাজে এই তিনটি গুণ না থাকলে "এক দেহ" হওয়া সম্ভব না।

রাসুল সা. আরো ইরশাদ করেন - "একজন মুমিন অপর মুমিনের জন্য একটি দালানের ন্যায়। যার এক অংশ আরেক অংশকে মজবুত করে।"(সহিহ বুখারি:২৪৪৬)
হাদিসদ্বয়ের মধ্যে  অনুভূতি ও সহযোগিতার মাধ্যমে  শক্তিশালী উম্মাহ গঠনের কথা স্পষ্ট হয়েছে। 

কুরআনের নির্দেশনা:
কুরআন সরাসরি "এক দেহ" শব্দ ব্যবহার না করলেও পুরো কুরআন জুড়ে এই বার্তাই আছে।

ভ্রাতৃত্বের ঘোষণা: "নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।" (সূরা হুজুরাত: ১০) ভাই হলে ভাইয়ের ব্যথা নিজের ব্যথা। ভাই ঝগড়া করলে মীমাংসা করা ভাইয়েরই দায়িত্ব।
ঐক্যের নির্দেশ: "তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে শক্ত করে ধরো এবং বিভক্ত হয়ো না।" (সূরা আলে ইমরান: ১০৩) দেহ কখনো নিজে নিজে দুই টুকরা হয় না। কেউ কেটে দিলে তবেই হয়। মুসলিমদের বিভক্তি ও বাইরের ষড়যন্ত্র  ভেতরের দুর্বলতার ফল।

সহযোগিতার আদেশ: "তোমরা নেকি ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সাহায্য করো। গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সাহায্য করো না।"(সূরা মায়িদা: ২)
হাত কেটে গেলে পা দৌড়ে পানি আনে। কিন্তু পা যদি বলে "আমার কী", তাহলে পুরো শরীর পঙ্গু।

নেতৃত্বের আদর্শ: আল্লাহ তাঁর রাসূলের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, "তোমাদের কষ্ট তার কাছে খুবই কষ্টকর। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু।" (সূরা তওবা: ১২৮) উম্মাহর প্রতিটি সদস্যের মধ্যেও এই গুণ থাকতে হবে।

অনুভূতি ও প্রয়োজনের ঐক্য - ভালোবাসা ও প্রতিরক্ষার ঐক্য : 
অনুভূতির ঐক্য -  দেহের নার্ভ সিস্টেম পুরো শরীরকে যুক্ত রাখে। এক জায়গায় আঘাত লাগলে ব্রেনে সিগন্যাল যায়। তেমনি একজন মুসলিমেরও "ঈমানী নার্ভ" থাকতে হবে। ফিলিস্তিনে বোমা পড়লে, সিরিয়ায় শিশু কাঁদলে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুন লাগলে অন্তর কাঁপবে। চোখে পানি আসবে। উদাসীনতা মানে নার্ভ ডেড হয়ে যাওয়া। তাই আমাদের ঐক্যের বিকল্প নেই। 

প্রয়োজনের ঐক্য - অসুস্থ অঙ্গকে সুস্থ অঙ্গগুলো সেবা করে। হাত খাবার মুখে তুলে দেয়, চোখ রাস্তা দেখায়।
আমাদের সমাজেও তাই। ধনী গরিবকে সাহায্য করবে, শিক্ষিত মূর্খকে শেখাবে, সুস্থ অসুস্থকে দেখবে। যাকাত, সদকা, স্বেচ্ছাসেবা - সবই এই " উম্মাহ বা দেহের সেবা"।

ভালোবাসার ঐক্য - দেহের অঙ্গগুলো পরস্পরের শত্রু না। লিভার কিডনিকে হিংসা করে না। চোখ কানকে ছোট করে দেখে না। কিন্তু আমরা? মাযহাব নিয়ে, দল নিয়ে, ভাষা নিয়ে কত বিভক্তি!! অথচ হাদিস বলছে, মুমিন মুমিনের আয়না।

প্রতিরক্ষার ঐক্য - শরীরে জীবাণু ঢুকলে WBC (White Blood Cell) শ্বেত রক্তকণিকা একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে। একটি অঙ্গ আক্রান্ত হলে পুরো ইমিউন সিস্টেম কাজ করে। তেমনি যখন উম্মাহর উপর যখন আক্রমণ আসে, তখনও সবার একসাথে দাঁড়ানো উচিত। কেউ কলম দিয়ে, কেউ অর্থ দিয়ে, কেউ শক্তি দিয়ে,  কেউ দোয়া দিয়ে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিকতা:
আজ আমরা "উম্মাহ" শব্দটা ভুলতে বসেছি। আমাদের পরিচয় হয়ে গেছে - বাংলাদেশি, ভারতীয়, আরবি, অনলাইন এক্টিভিস্ট, অফলাইন এক্টিভিস্ট।
কিন্তু রাসূল সা. এর যুগে সাহাবিরা ছিলেন এক দেহ। আবু বকর রা. এর সম্পদ, উমর রা. এর ন্যায়, উসমান রা. এর দানশীলতা, আলী রা. এর শৌর্য ইত্যাদি সব মিলে একটা দেহ ছিলো।

কিন্তু আজকের সমস্যা হলো-গাজা ও বিভিন্ন মুসলমানদের উপর নির্যাতনের খবর দেখে আমরা "Sad react"  দিয়েই দায়িত্ব শেষ করি। দেহের মতো ব্যথা অনুভব করি না। নিজের ক্যারিয়ার, নিজের পরিবার ঠিক থাকলেই হলো। পাশের মানুষের খোঁজ নিই না। বরং সামান্য মতপার্থক্যে একে অপরকে কাফের, মুনাফিক ট্যাগ দেই। যার কারণে দেহ নিজেই নিজেকে কাটছে।যার ফলাফল হলো- যেমন বিচ্ছিন্ন ইট দিয়ে কোনো ইমারত দাঁড়ায় না। তেমনি আজ আমরা কোটি কোটি হয়েও অসহায়। এবং অন্যের ধারে হাত বাড়ায়।তাই বলবো' এসব থেকে উত্তোরণের জন্য এক ভাই অপর ভাইয়ের সদা পাশে থাকা।

পরিশেষে বলি- 
"এক দেহের উপমা" কোনো আবেগী কলাম বা বক্তৃতা না। এটা ঐক্যের সূত্র। একটি দেহের হাত যদি পা কে লাথি মারে, তাহলে লাভ কার? ক্ষতি সবার।

আল্লাহ আমাদের সেই তাওফিক দিন, যাতে আমরা সত্যিকার অর্থে "এক দেহ" হতে পারি। যেখানে একজনের চোখের পানি মানেই সবার চোখের পানি। একজনের বিজয় মানেই সবার বিজয়।
কারণ কিয়ামতের দিন আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন না "তুমি কোন দলের ছিলে?" তিনি জিজ্ঞেস করবেন, "তুমি তোমার ভাইয়ের জন্য কী করেছো?"
আসুন, উত্তরটা যেন আমাদের লজ্জিত না করে।

আনোয়ার হোসেন 
কাগজিখোলা, বাইশারী, নাইক্ষ্যংছড়ি, বান্দরবান। 
শিক্ষক: পীস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ, চট্টগ্রাম।

রিটেলেড নিউজ


সর্বপঠিত খবর

ক্যালিফোর্নিয়ায় আন্তর্জাতিক গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে চট্টগ্রামের মেধাবী সন্তান প্রিয়ম চক্রবর্তীর যোগদান

ক্যালিফোর্নিয়ায় আন্তর্জাতিক গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে চট্টগ্রামের মেধাবী সন্তান প্রিয়ম চক্রবর্তীর যোগদান

আমাদের ডেস্ক : : ডেস্ক রিপোর্ট :: চট্টগ্রামস্থ  লোহাগাড়ার  কৃতি সন্তান প্রিয়ম চক্রবর্তী ক্যালিফোর্নিয়ায় ...বিস্তারিত


সেতু মোটরসের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন ও এমডি আব্দুল কাইয়ুমের  ঈদ শুভেচ্ছা!

সেতু মোটরসের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন ও এমডি আব্দুল কাইয়ুমের ঈদ শুভেচ্ছা!

আমাদের ডেস্ক : : আসন্ন ঈদ উল আযহা উপলক্ষে বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, সেতু মোটরসের চেয়ারম্...বিস্তারিত



সর্বশেষ খবর