শিরোনাম
আমাদের ডেস্ক : | ০৮:৪২ পিএম, ২০২৬-০৮-৩০
১. অবতরনিকা : সময়ের মহাপ্রবাহে কত নাম উচ্চারিত হয়, কত নামই বা কালের নীরবতায় হারিয়ে যায়। অথচ কিছু জীবন সময়ের স্রোতে ভেসে যায় না—সময়ের বুকেই রেখে যায় এমন দীপ্ত স্বাক্ষর, যার আলো প্রজন্ম পেরিয়েও ম্লান হয় না। তাঁদের পরিচয় পদবি
দিয়ে নয়; তাঁদের জীবনই তাঁদের পরিচয়, কর্মই তাঁদের উত্তরাধিকার।
মুর্শিদে মিল্লাত, আরিফ বিল্লাহ হযরত মাওলানা মুফতী আবুল কাসেম নোমানী সাহেব দামাত বারাকাতুহুম—তেমনই এক বিরল মনীষা। তাঁর সত্তায় ইলমের গভীরতা, আমলের সৌন্দর্য,
ইখলাসের নির্মলতা, রুহানিয়াতের প্রশান্তি, প্রজ্ঞার দীপ্তি ও বিনয়ের মাধুর্য যেন একই আলোকবৃত্তে এসে মিলেছে। তাঁর ইলমে গাম্ভীর্য আছে, অথচ আচরণে অনাড়ম্বর সরলতা; ব্যক্তিত্বে মর্যাদার উজ্জ্বল্য আছে, অথচ সান্নিধ্যে হৃদয়জুড়ানো কোমলতা।
দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম ও শায়খুল হাদীস হিসেবে তাঁর আসন নিছক একটি পদ নয়—এ
এক সুদীর্ঘ ইলমি উত্তরাধিকারের অর্পিত আমানত। দেওবন্দ শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়;
এটি সাধনা ও উত্তরাধিকারের এমন এক দীপ্ত মশাল, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ইলমের আলো
বহন করে এসেছে। সেই মশাল ধারণ করা মানে কেবল বর্তমানকে পরিচালনা করা নয়;
পূর্বসূরিদের সাধনার মর্যাদা রক্ষা করে আগামী দিনের হাতে সেই আলো আরও নির্মল করে
তুলে দেওয়া।
এই আমানতবোধই তাঁর নেতৃত্বের প্রাণ। তাঁর কাছে কর্তৃত্বের চেয়ে দায়িত্ব বড়,
আসনের চেয়ে আমানত মহত্তর। ছাত্র তাঁর কাছে কেবল শিক্ষার্থী নয়—আগামী দিনের
সম্ভাবনা; শিক্ষাঙ্গন কেবল পাঠদানের স্থান নয়—মানুষ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের কর্মশালা;
আর ইলম কেবল মস্তিষ্কের সঞ্চয় নয়—হৃদয় জাগানো, চরিত্র গড়া এবং জীবন আলোকিত করার
শক্তি।
তাঁর মাহাত্ম্যের সবচেয়ে সুন্দর অলঙ্কার তাঁর বিনয়। কারণ প্রকৃত ইলম মানুষকে
উচ্চতায় তোলে, আবার নত হতেও শেখায়। তাঁর মর্যাদা তাই দূরত্ব সৃষ্টি করে না;
গাম্ভীর্য হৃদয়ের উষ্ণতাকে আড়াল করে না। তাঁর রুহানিয়াতও কোনো প্রদর্শনের বিষয়
নয়—তা অনুভূত হয় কথার কোমলতায়, ব্যবহারের সৌন্দর্যে, জীবনের সংযমে এবং মানুষের
প্রতি অকৃত্রিম মমতায়।
তাঁর ব্যক্তিত্বে যেন গুণের এক বিরল সুষমা—ইলম আছে, অহংকার নেই; মর্যাদা আছে,
আত্মম্ভরিতা নেই; নেতৃত্ব আছে, ঔদ্ধত্য নেই; রুহানিয়াত আছে, প্রদর্শন নেই।
গাম্ভীর্যের আবরণ পেরিয়েও সেখানে হৃদয়ের দরজা উন্মুক্ত। এই সুষমাই তাঁকে কেবল
একজন আলেম বা শায়খের পরিচয়ে আবদ্ধ রাখেনি; করেছে মুরব্বি, পথপ্রদর্শক এবং জীবন্ত
আদর্শ।
তাঁর সান্নিধ্য যেন নীরব এক পাঠশালা। সেখানে অনেক সময় কোনো দীর্ঘ উপদেশের প্রয়োজন
হয় না—একটি বাক্য চিন্তার দুয়ার খুলে দেয়, একটি আচরণ বিনয়ের পাঠ পড়ায়, একটি
সিদ্ধান্ত দায়িত্বের গভীরতা অনুভব করায়। প্রকৃত মুরব্বির প্রভাব এমনই—তিনি
পরিবর্তনের কথা কম বলেন; তাঁর জীবনই নিঃশব্দে হৃদয়ের মাটিতে পরিবর্তনের বীজ বুনে
যায়।
আর এই আলোকযাত্রা কোনো অতীতের অধ্যায় নয়—এ আজও প্রবহমান। হাতে ইলমি উত্তরাধিকারের
আমানত, হৃদয়ে খেদমতের অঙ্গীকার, সামনে নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশা—তাঁর জীবন তাই
সমাপ্ত কোনো জীবনী নয়; এটি এক চলমান সাধনা, এক অবিরাম আলোকধারা।
তাঁকে নিয়ে লেখা তাই নিছক প্রশংসার শব্দমালা নয়; এক জীবন্ত ইলমি উত্তরাধিকারের
স্পন্দনকে শব্দের শরীরে ধারণ করার বিনম্র প্রয়াস। তাঁর জীবন যেন নীরবে উচ্চারণ
করে—ইলমকে গভীর করো, আমলকে সুন্দর করো, ইখলাসে জীবনকে নির্মল করো, নেতৃত্বকে আমানত
মনে করো; এমনভাবে বেঁচে থাকো, যাতে নামের চেয়ে কর্ম, উপস্থিতির চেয়ে প্রভাব এবং
জীবনের চেয়ে উত্তরাধিকার দীর্ঘজীবী হয়।
কিছু জীবন সময়ের সাক্ষী হয়; কিছু জীবন সময়কে সাক্ষ্য দিতে শেখায়। আর কিছু বিরল
জীবন—নিজেই হয়ে ওঠে এক অনির্বাণ আলোকধারা, যার দীপ্তি শব্দের সীমা পেরিয়ে হৃদয়ে
পৌঁছে যায়, এক প্রজন্মের অন্তর থেকে আরেক প্রজন্মের অন্তরে নীরবে জ্বেলে যায় ইলম,
আদর্শ ও আলোর প্রদীপ।
সেই আলোর পথেই তিনি আজও—নিভৃত অথচ দীপ্ত, নীরব অথচ প্রভাবময়, বিনম্র অথচ
অনুপ্রেরণাদায়ী; নিজের জন্য নয়, এক বৃহত্তর আমানতের জন্য।
২. শৈশবের স্নিগ্ধ প্রাঙ্গণ থেকে ইলমের দিগন্তে
কিছু জীবনের সূচনা হয় নিছক জন্মের মধ্য দিয়ে নয়; মমতার কোমল ছায়ায়, ভালোবাসার
নীরব পরশে এবং এক অদৃশ্য আলোর বীজ বপনের মধ্য দিয়ে। হযরত মাওলানা মুফতী আবুল কাসেম
নুমানী দামাত বারাকাতুহুমের ইলমি যাত্রার সূচনাও তেমনই এক স্নিগ্ধ আবহে।
২২ সফর ১৩৬৬ হিজরি মোতাবেক ১৪ জানুয়ারি ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে বেনারসের মদনপুরায় তাঁর
জন্ম। জ্ঞানজীবনের প্রথম পাঠ তিনি গ্রহণ করেন মাতা ও দাদার স্নেহময় তত্ত্বাবধানে।
সেই মমতাময় পরিবেশেই তাঁর অন্তরে রোপিত হয় জ্ঞানপিপাসার প্রথম বীজ; সময়ের সঙ্গে
যার শিকড় গভীর হয়েছে, পরিসর বিস্তৃত হয়েছে, আর একদিন তা তাঁকে নিয়ে গেছে ইলমের
সুদূর দিগন্তে।
শৈশবের সেই পরিমণ্ডল পেরিয়ে তাঁর পদযাত্রা ক্রমে এগিয়ে চলে জ্ঞানের বিস্তৃত
অঙ্গনের দিকে। জামিয়া ইসলামিয়া মদনপুরা, বেনারস; দারুল উলুম মৌ; এবং জামিয়া
মিফতাহুল উলুম, মৌ—প্রতিটি শিক্ষাঙ্গন তাঁর শিক্ষাজীবনের পথে একেকটি গুরুত্বপূর্ণ
মাইলফলক হয়ে ওঠে। অবশেষে সেই পথ এসে মিলিত হয় উপমহাদেশের ঐতিহাসিক ইলমি তীর্থ
দারুল উলুম দেওবন্দে। ১৩৮২ হিজরি মোতাবেক ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি সেখানে ভর্তি হন।
গভীর নিষ্ঠা, নিরলস অধ্যবসায় ও জ্ঞানের প্রতি অদম্য আকর্ষণ নিয়ে অধ্যয়ন শেষে
১৩৮৭ হিজরি মোতাবেক ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করেন। এরপর একই
প্রতিষ্ঠানের ইফতা বিভাগে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে তাঁর ইলমি সাধনা লাভ করে
আরও গভীরতা, পরিপক্বতা ও প্রজ্ঞা।
ইলমি জীবনের এই পর্যায়েই হাদীসের নববী প্রজ্ঞা ও ফিকহের সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টির
সঙ্গে তাঁর যে নিবিড় সখ্য গড়ে ওঠে, পরবর্তী জীবনে সেটিই তাঁর চিন্তা ও ইলমি
ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে প্রকাশ পায়। একদিকে হাদীসের নূর, অন্যদিকে
ফিকহের গভীর প্রজ্ঞা—এই দুই স্রোতের মিলনে তাঁর চিন্তার জগতে গড়ে ওঠে এক অপূর্ব
ভারসাম্য। হাদীস তাঁকে দেয় নূরের দিশা, ফিকহ দেয় উপলব্ধির গভীরতা; আর দুয়ের
সমন্বয় তাঁর দৃষ্টিকে করে প্রশস্ত, চিন্তাকে ভারসাম্যপূর্ণ এবং আলেমসত্তাকে
সুসংহত।
শৈশবের মমতামাখা প্রাঙ্গণ থেকে দেওবন্দের ঐতিহাসিক ইলমি অঙ্গন পর্যন্ত তাঁর এই
পথচলা তাই কেবল কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ও কয়েকটি সনের ধারাবাহিক বিবরণী
নয়; এটি এক জ্ঞানতৃষ্ণ হৃদয়ের ক্রমবিকাশের কাহিনী। যে যাত্রার প্রথম পাঠ লেখা
হয়েছিল পারিবারিক স্নেহের পরিমণ্ডলে, যার দিগন্ত ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়েছে হাদীস
ও ফিকহের জগতে, আর যার পরিণত পর্বে এসে দেওবন্দ হয়ে উঠেছে তাঁর ইলমি ব্যক্তিত্ব
নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
শৈশবে যে জ্ঞানপিপাসার বীজ নীরবে অঙ্কুরিত হয়েছিল, দীর্ঘ সাধনা ও অধ্যবসায়ে তা-ই
ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে এক সুদৃঢ় ইলমি বৃক্ষে। আর সেই বৃক্ষের ছায়াতেই পরবর্তী
জীবনে বিকশিত হয়েছে তাঁর শিক্ষা, ইফতা, রচনা, তাযকিয়া ও খেদমতের বিস্তৃত পরিসর।
৩. মহান উস্তাদদের সান্নিধ্যে : ইলম ও আদবের দীপ্ত সাধনা
দারুল উলুম দেওবন্দে তাঁর শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও সৌভাগ্যময় অধ্যায় ছিল
মহান মনীষীদের সান্নিধ্য লাভ। হযরত মাওলানা সৈয়দ ফখরুদ্দীন আহমদ রহ., হযরত মাওলানা
মুহাম্মদ ইবরাহীম বলিয়াভী রহ., হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান গাঙ্গোহী রহ., হযরত
মাওলানা ওয়াহীদুজ্জামান কিরানভী রহ. প্রমুখ যুগশ্রেষ্ঠ আলেমের দরসে বসে তিনি ইলম
অর্জনের বিরল সৌভাগ্য লাভ করেন। তাঁদের নাম উচ্চারিত হলেই যেন দেওবন্দের
গৌরবোজ্জ্বল ইলমি আকাশে এক দীপ্ত নক্ষত্রমালার স্মৃতি জেগে ওঠে—যাঁদের আলো
প্রজন্মের পর প্রজন্ম জ্ঞানপিপাসু হৃদয়কে পথ দেখিয়ে চলেছে।
এই মহান মনীষীদের সান্নিধ্য নিছক পাঠগ্রহণের পরিসর ছিল না; বরং ছিল ইলম ও আদব,
গবেষণা ও আমানতদারিতা, ফতোয়া ও দায়িত্ববোধ, শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির এক জীবন্ত
পাঠশালা। তাঁদের প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি আচরণ, এমনকি অনেক সময় তাঁদের নীরবতাও ছিল
একেকটি শিক্ষা—যা অন্তরকে পরিশীলিত করত, চিন্তাকে শাণিত করত এবং চরিত্রকে বিনয় ও
ভারসাম্যে গড়ে তুলত।
তাঁদের দরসে বসে তিনি শুধু কিতাবের পৃষ্ঠা পাঠ করেননি; বরং খুলে গিয়েছিল তাঁর
চিন্তার নতুন দিগন্ত। উস্তাদদের গভীর দৃষ্টি, সংযত ভাষা, সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ও
প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যাখ্যা তাঁর মানসে এভাবে প্রোথিত হয়েছিল, যা পরবর্তী জীবনে তাঁর
ইলমি চিন্তা ও কর্মপদ্ধতিতে স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। ফলে তাঁর জ্ঞানে যেমন গভীরতা ও
বিস্তারের সমন্বয় দেখা যায়, তেমনি চিন্তায় স্থিরতা, সিদ্ধান্তে ভারসাম্য এবং
বক্তব্যে পরিমিত প্রজ্ঞার সৌন্দর্যও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কিন্তু এই সান্নিধ্যের সবচেয়ে মূল্যবান অর্জন ছিল কেবল জ্ঞান নয়—জ্ঞানকে ধারণ
করার আদব। তিনি শিখেছিলেন, ইলম শুধু জানা নয়; তার হক আদায় করা। ফতোয়া শুধু হুকুম
বলা নয়; তার পেছনে দায়িত্ব ও জবাবদিহির অনুভব থাকা। গবেষণা শুধু মত প্রতিষ্ঠা
নয়; সত্যের প্রতি নিষ্ঠা ও ইনসাফের দাবি মেনে চলা। আর শিক্ষা শুধু তথ্য পৌঁছে
দেওয়া নয়; মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও অন্তর নির্মাণেরও এক মহান আমানত।
এভাবেই মহান উস্তাদদের সান্নিধ্য তাঁর মধ্যে গড়ে তোলে ইলম ও আদবের এক গভীর
সমন্বয়। তাঁদের কাছ থেকে তিনি শুধু কী শিখতে হয় তা-ই শেখেননি; শিখেছেন কীভাবে
ইলমকে ধারণ করতে হয়, কীভাবে তা আমলে রূপ দিতে হয় এবং কীভাবে সেই আমানত পরবর্তী
প্রজন্মের হাতে পৌঁছে দিতে হয়। এ উত্তরাধিকারই পরবর্তী জীবনে তাঁর ইলমি
ব্যক্তিত্বের অন্যতম দীপ্ত ভিত্তি হয়ে ওঠে।
৪. হযরত গাঙ্গোহী রহ.-এর সান্নিধ্যে ইলম, তাযকিয়া ও ইস্তিকামাতের পাঠ
কিছু সান্নিধ্য কেবল স্মৃতি হয়ে থাকে না; তা হয়ে ওঠে চরিত্রের নির্মাণভূমি,
চিন্তার দিকনির্দেশ এবং আত্মার দীর্ঘ যাত্রার নীরব সহচর। হযরত মুফতী মাহমুদুল হাসান
গাঙ্গোহী রহমাতুল্লাহি আলাইহির সঙ্গে হযরত মুফতী আবুল কাসেম নোমানী সাহেবের সম্পর্ক
ছিল তেমনই এক গভীর ও তাৎপর্যময় অধ্যায়—যেখানে ফিকহের সূক্ষ্মতা মিলেছিল তাযকিয়ার
স্বচ্ছতায়, ইলমের গভীরতা যুক্ত হয়েছিল তাকওয়া ও ইস্তিকামাতের দৃঢ়তার সঙ্গে।
হযরত গাঙ্গোহী রহ. ছিলেন ফিকহ ও ফতোয়ার জগতে এক অসাধারণ মনীষা; সুন্নাহনিষ্ঠ জীবন,
গভীর তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির সাধনায়ও তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল আদর্শ। তাঁর সান্নিধ্যে
হযরত নোমানী সাহেব কেবল মাসআলার সূক্ষ্মতা ও ফিকহি প্রজ্ঞার পাঠ নেননি; শিখেছেন
ইলমের আদব, নফসের সংযম, অন্তরের পরিচ্ছন্নতা এবং জ্ঞানকে জীবনের আচরণে রূপ দেওয়ার
সৌন্দর্য। সেখানে কিতাবের পৃষ্ঠা ও জীবনের পৃষ্ঠা যেন পাশাপাশি উন্মোচিত হয়েছিল।
পরবর্তীতে হযরত গাঙ্গোহী রহ. তাঁকে খিলাফত ও ইজাজত প্রদান করেন। এটি ছিল নিছক
আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নয়; বরং দীর্ঘ সান্নিধ্যে গড়ে ওঠা আস্থা, স্নেহ ও যোগ্যতার এক
মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি—একজন মুরব্বির পক্ষ থেকে এমন এক আমানত অর্পণ, যার সঙ্গে
যুক্ত ছিল ইলম, ইসলাহ ও দায়িত্বের উত্তরাধিকার।
হযরত নোমানী সাহেবের পরবর্তী জীবন সেই সান্নিধ্যের বহু নীরব পাঠকে দৃশ্যমান করে
তুলেছে। তাঁর ফিকহি প্রজ্ঞার সঙ্গে আত্মসংযম, জ্ঞানের সঙ্গে আত্মসংশোধন,
সিদ্ধান্তের সঙ্গে জবাবদিহির অনুভূতি এবং বক্তব্যের সঙ্গে আমলের সামঞ্জস্য—এসবের
মধ্যে সেই তাযকিয়ামুখী শিক্ষার গভীর ছাপ প্রতিফলিত হয়। যেন তাঁর হাতে কেবল
মাসআলার মশালই অর্পিত হয়নি; অন্তরকে যাচাই করার একটি নীরব প্রদীপও জ্বেলে দেওয়া
হয়েছিল।
এই সাধনার মেরুদণ্ড ছিল ইস্তিকামাত—পরিস্থিতি বদলালেও সত্যের অবস্থান না বদলানো,
প্রশংসা ও নিন্দার ঊর্ধ্বে উঠে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের মাপকাঠি করে নেওয়া এবং
গোপন-প্রকাশ্য সর্বাবস্থায় নিজেকে তাঁর সামনে জবাবদিহির উপযোগী রাখা। তাযকিয়াও
তাই তাঁর কাছে কেবল নির্জন সাধনার নাম নয়; বরং উপার্জনে পবিত্রতা, আচরণে সংযম,
সিদ্ধান্তে ন্যায়, প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর
উপস্থিতি অনুভব করার এক অবিচ্ছিন্ন সাধনা।
এই শিক্ষার সারকথা ছিল সহজ অথচ গভীর—ইলমের সত্যতা তার দাবিতে নয়, তার প্রভাবে; আর
ইস্তিকামাতের সৌন্দর্য কোনো ক্ষণিক আবেগে নয়, দীর্ঘ জীবনের অবিচল ধারাবাহিকতায়।
মানুষ যা জানে, তার সাক্ষ্য যেন তার জীবন দেয়; অন্তরের বিশ্বাস যেন কর্মে সত্য
হয়ে ওঠে। কেরামতের চমক হয়তো মুহূর্তকে আলোড়িত করে, কিন্তু নীরব আনুগত্য, সুদৃঢ়
ইস্তিকামাত ও সত্যনিষ্ঠ আমলই মানুষের জীবন পেরিয়ে উত্তরাধিকার হয়ে থাকে।
হযরত গাঙ্গোহী রহ.-এর সান্নিধ্য তাই তাঁর জীবনে কেবল একটি শিক্ষাপর্ব ছিল না; ছিল
ইলমকে আমলে, জ্ঞানকে তাযকিয়ায় এবং সাধনাকে ইস্তিকামাতে রূপ দেওয়ার এক গভীর
প্রশিক্ষণ। সেই সান্নিধ্যের আলো পরবর্তী জীবনে তাঁর ইলমি প্রজ্ঞা, আত্মসংযম ও
আমানতদারির মধ্যে দীর্ঘকাল দীপ্ত হয়ে থেকেছে।
৫. শিক্ষকতা ও ইফতার ময়দানে দীর্ঘ সাধনা
ইলম অর্জনের পর আসে সেই ইলমকে মানুষের কল্যাণে প্রবাহিত করার অধ্যায়—জ্ঞানকে আমানত
হিসেবে ধারণ করে তা শিক্ষাদান, ইরশাদ ও খেদমতের মাধ্যমে জীবন্ত করে তোলার সময়।
হযরত মুফতী আবুল কাসেম নোমানী দামাত বারাকাতুহুমের কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক পর্ব
শুরু হয় জামিয়া ইসলামিয়া রেওয়ারি তালব, বেনারসে। সেখানে দীর্ঘকাল তিনি শায়খুল
হাদীস ও সদর মুফতীর দায়িত্ব পালন করেন। ফলে তাঁর সামনে একই সঙ্গে উন্মুক্ত হয়
ইলমের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ময়দান—দরসের মসনদ ও ইফতার প্রাঙ্গণ।
দরসের আসরে তিনি ছাত্রদের সামনে হাদীসের গভীর অর্থ ও নববী প্রজ্ঞার দ্বার উন্মোচন
করতেন; আর ইফতার ময়দানে মানুষের বাস্তব জীবন, সংশয় ও নিত্যনতুন সমস্যার মুখোমুখি
হয়ে শরিয়তের আলোকে তাদের পথনির্দেশ দিতেন। একদিকে ভবিষ্যতের আলেম গড়ার দায়িত্ব,
অন্যদিকে মানুষের বর্তমান জীবনকে দ্বীনের বিধানের সঙ্গে সুষমভাবে যুক্ত করার
প্রয়োজন—এই দুই অভিজ্ঞতার সম্মিলন তাঁর চিন্তাকে করে তোলে আরও পরিণত, বিচক্ষণ ও
জীবনঘনিষ্ঠ।
দীর্ঘ শিক্ষকতার সাধনা তাঁকে শিখিয়েছিল—কীভাবে গভীর বিষয়কে সহজ ও হৃদয়গ্রাহী
ভাষায় উপস্থাপন করতে হয়, কোন কথা জ্ঞানের পরিধি বাড়ায় আর কোন কথা অন্তরকে
জাগিয়ে তোলে। আর দীর্ঘ ইফতা-অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছিল মানুষের জীবনকে তার
বাস্তবতার ভেতর থেকে দেখতে—তাদের প্রশ্নের পেছনের প্রেক্ষাপট, সংশয়ের অন্তর্নিহিত
কারণ এবং
সমস্যার প্রকৃত চেহারা বুঝতে। ফলে তাঁর ফিকহি দৃষ্টি কেবল গ্রন্থের অক্ষরে সীমাবদ্ধ
থাকেনি; তা স্পর্শ করেছে মানুষের জীবনের বাস্তব মাটিরে।
এই দীর্ঘ সাধনায় দরসগাহ তাঁকে দিয়েছে মানুষ গড়ার অভিজ্ঞতা, আর ইফতা দিয়েছে
মানুষ বোঝার প্রজ্ঞা। কিতাবের জ্ঞান সেখানে জীবনের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে;
তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা বাস্তবতার পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে; আর শিক্ষা ও ইফতার সমন্বিত
অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে নির্মাণ করেছে এক পরিণত আলেমসত্তা—যার কাছে ইলম কেবল জানার
বিষয় নয়; বোঝার, আমল করার এবং মানুষের কল্যাণে পৌঁছে দেওয়ার এক মহান আমানত।
এভাবেই তাঁর শিক্ষকতা ও ইফতার দীর্ঘ পর্বটি কেবল কর্মজীবনের একটি অধ্যায় হয়ে
থাকেনি; বরং তাঁর ইলমি ব্যক্তিত্বের পরিণত রূপ নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ
সাধনাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
৬. দেওবন্দে প্রত্যাবর্তন: ছাত্রজীবনের পদচিহ্ন থেকে আমানতের মসনদে :
জীবনের কিছু ঠিকানা কেবল স্মৃতিতে থাকে না; মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে যায়।
দারুল উলুম দেওবন্দ হযরত মুফতী আবুল কাসেম নোমানী দামাত বারাকাতুহুমের জন্য তেমন এক
আপন ঠিকানা। যে প্রাঙ্গণে একদিন তিনি এসেছিলেন জ্ঞানপিপাসু ছাত্র হয়ে, সময়ের
দীর্ঘ পরিক্রমায় সেই প্রাঙ্গণই একদিন তাঁর হাতে তুলে দেয় বৃহত্তর দায়িত্ব ও
আস্থার আমানত।
১৯৯২ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের মজলিসে শূরার স্থায়ী সদস্য
হিসেবে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ইলমি ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিবিড়ভাবে
যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ এই পর্ব তাঁকে প্রতিষ্ঠানের নীতি, ঐতিহ্য, অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও
দায়িত্বের বহুমুখী বাস্তবতা খুব কাছ থেকে বোঝার সুযোগ দেয়। যে দেওবন্দে তিনি
একদিন ছাত্র হয়ে ইলম গ্রহণ করেছিলেন, এবার সেই প্রতিষ্ঠানকেই তিনি দেখলেন এক আমানত
হিসেবে—যার রক্ষণাবেক্ষণ, স্বাতন্ত্র্য ও উত্তরাধিকার সংরক্ষণও এক বিশেষ দায়িত্ব।
অবশেষে ২৪ জুলাই ২০১১ সালে হযরত মাওলানা গোলাম মুহাম্মদ বাস্তনভী সাহেবের পর তাঁকে
দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম নির্বাচিত করা হয়। মুহূর্তটি যেন তাঁর জীবনের দীর্ঘ
পথের এক তাৎপর্যময় প্রত্যাবর্তন—প্রাঙ্গণ একই, কিন্তু ভূমিকা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে
তরুণ একদিন সেখানে বসে উস্তাদদের কাছ থেকে ইলম গ্রহণ করেছিলেন, কয়েক দশক পর সেই
তিনিই ফিরে এলেন সেই প্রতিষ্ঠানের আমানত বহনের দায়িত্ব নিয়ে।
তবে মুহতামিমের মসনদ তাঁর কাছে ক্ষমতার আসন ছিল না; ছিল এক ভারী আমানতের স্থান। এর
সঙ্গে জড়িয়ে ছিল দেওবন্দের দীর্ঘ ইলমি ঐতিহ্য, পূর্বসূরিদের ত্যাগ ও সাধনা,
অসংখ্য উস্তাদের উত্তরাধিকার এবং দেশ-বিদেশের অগণিত মানুষের প্রত্যাশা। তাই এ
দায়িত্ব ছিল শুধু একটি প্রশাসনিক পদ নয়; ছিল একটি জীবন্ত উত্তরাধিকারকে ধারণ করা,
তার স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা এবং আগামী প্রজন্মের হাতে তা বিশ্বস্তভাবে পৌঁছে
দেওয়ার অঙ্গীকার।
আর এই দায়িত্ব যেন হঠাৎ তাঁর জীবনের সামনে এসে দাঁড়ায়নি। ছাত্রজীবনের ইলম,
গাঙ্গোহী রহ.-এর সান্নিধ্যের তাযকিয়া, দীর্ঘ শিক্ষকতা ও ইফতার অভিজ্ঞতা এবং শূরার
বহু বছরের সম্পৃক্ততা—জীবনের প্রতিটি অধ্যায় অদৃশ্যভাবে তাঁকে এই বৃহত্তর আমানতের
জন্য প্রস্তুত করে এনেছিল।
এভাবেই দেওবন্দে তাঁর প্রত্যাবর্তন কেবল একটি প্রতিষ্ঠানে ফিরে আসার ঘটনা ছিল না;
ছিল তালিবে ইলম থেকে আমানতদার, গ্রহণকারী থেকে রক্ষক, এবং ছাত্রজীবনের পদচিহ্ন থেকে
নেতৃত্বের মসনদে এক দীর্ঘ যাত্রার পূর্ণতা।
৭. হাদীসের মসনদে: উস্তাদ থেকে মুরব্বি
২০২০ সালে হযরত মাওলানা মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকালের
পর হযরত মুফতী আবুল কাসেম নোমানী দামাত বারাকাতুহুম দারুল উলুম দেওবন্দে হাদীসের
দরসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সহীহ বুখারী শরীফের প্রথম খণ্ড
পাঠদানের সঙ্গে যুক্ত হন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনের দীর্ঘ ইলমি সাধনা যেন এসে
মিলিত হয় নববী ইলমের সেই মসনদে, যেখানে একদিন তিনি নিজেই ছিলেন একজন নিবেদিত
ছাত্র।
দারুল উলুম দেওবন্দের শূরা-নির্ভর ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থায় মুহতামিম ও শায়খুল
হাদীস—উভয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব একই ব্যক্তির ওপর একসঙ্গে অর্পিত হওয়া ছিল এক
বিরল ঘটনা। এটি তাঁর জন্য নিঃসন্দেহে এক মহান আমানত এবং আল্লাহ তাআলার বিশেষ
অনুগ্রহ ও তাওফিকের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
তবে এই দায়িত্বের মাহাত্ম্য কেবল পদমর্যাদায় নয়; এর গভীরতর সৌন্দর্য নিহিত
রয়েছে তাঁর জীবনযাত্রার এক অনন্য পূর্ণতায়। যে অঙ্গনে একদিন তিনি উস্তাদদের সামনে
বসে হাদীসের নববী বাণী শুনেছিলেন, অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর সেই অঙ্গনেই তিনি
নিজে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে বসে সেই বাণী ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন। একদিন তিনি
ছিলেন শ্রোতা; আজ তিনি বাণীর বাহক। একদিন তিনি গ্রহণ করেছিলেন; আজ তাঁর দায়িত্ব তা
বিশ্বস্ততার সঙ্গে পৌঁছে দেওয়া।
এ যেন সময়ের দীর্ঘ পরিক্রমায় ইলমি উত্তরাধিকারের এক পূর্ণ বৃত্ত—যে আলো তিনি
উস্তাদদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিলেন, সেই আলোই আজ তাঁর কণ্ঠের মাধ্যমে নতুন
প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ইলম এখানে কোনো ব্যক্তিগত
সম্পদ নয়; এটি এক আমানত, যা এক হৃদয় থেকে আরেক হৃদয়ে, এক প্রজন্ম থেকে আরেক
প্রজন্মে সম্মানে সঞ্চারিত হয়। একজন সত্যিকারের উস্তাদ তাই কেবল একটি দরস শেষ করেন
না; তিনি এমন এক ধারার অংশ হয়ে ওঠেন, যার প্রভাব তাঁর অনুপস্থিতিতেও বহমান থাকে।
হযরত নোমানী সাহেবের এই পর্বে সেই উত্তরাধিকারের সৌন্দর্য বিশেষভাবে প্রতিভাত হয়।
ছাত্রজীবনে যে দেওবন্দ তাঁর ইলমি পরিচয়ের ভিত নির্মাণ করেছিল, পরিণত বয়সে সেই
দেওবন্দেই তিনি হয়ে উঠলেন তার এক আমানতদার শিক্ষক ও মুরব্বি। তাঁর সামনে তখন শুধু
একটি কিতাবের পাঠ ছিল না; ছিল এমন এক প্রজন্ম, যার হাতে ভবিষ্যতের ইলমি উত্তরাধিকার
অর্পিত হবে।
তাই তাঁর দরসের তাৎপর্য কেবল হাদীসের পাঠদানে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মুরব্বি যখন হাদীস
পড়ান, তখন তিনি শুধু শব্দ ও অর্থ পৌঁছে দেন না; তাঁর সঙ্গে পৌঁছে যায় বোঝার একটি
পদ্ধতি, ইলমের একটি আদব, সত্য গ্রহণের একটি মানসিকতা এবং আমানত বহনের একটি
দায়িত্ববোধ। এ কারণেই একটি দরস শেষ হয়ে গেলেও তার প্রকৃত প্রভাব শেষ হয় না; তা
ছাত্রের চিন্তা, চরিত্র ও ভবিষ্যৎ কর্মের মধ্যে নতুন জীবন লাভ করে।
এভাবেই দেওবন্দ তাঁর জীবনে শুধু শিক্ষাগহণের স্থান থেকে শিক্ষাদানের ময়দান হয়ে
ওঠেনি; বরং হয়ে উঠেছে ইলমি উত্তরাধিকারের এক জীবন্ত সেতু—যেখানে ছাত্রত্ব এসে
মিশেছে উস্তাদিতে, গ্রহণ এসে পূর্ণতা পেয়েছে দানে, আর ইলম এসে রূপ নিয়েছে
তাজরিবা, তারবিয়াত ও আমানতের ধারাবাহিকতায়।
একদিন তিনি ছিলেন মসনদের সামনে বসা ছাত্র; আজ তিনি সেই মসনদে বসে নতুন প্রজন্মকে
সামনে নিয়ে চলেছেন। এভাবেই এক জীবনের দীর্ঘ সাধনা অন্য বহু জীবনের আলোকযাত্রার
সূচনা হয়ে ওঠে।
৮. সরলতার সৌন্দর্যে মাহাত্ম্যের এক নীরব প্রকাশ
কিছু মানুষকে দূর থেকে দেখলে তাঁদের ইলমের বিস্তার অনুভূত হয়; কাছে এলে বোঝা যায়
তাঁদের হৃদয়ের গভীরতা। আর কিছু বিরল ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের মাহাত্ম্যের সবচেয়ে
আপন পরিচয় প্রকাশ পায় তাঁদের স্বাভাবিক সরলতায়। হযরত মাওলানা মুফতী আবুল কাসেম
নোমানী দামাত বারাকাতুহুমের ব্যক্তিত্বে সেই সরলতা কোনো সাজানো বৈশিষ্ট্য নয়; বরং
গভীর ইলম, উচ্চ মর্যাদা ও দীর্ঘ সাধনায় পরিশীলিত এক স্বাভাবিক সৌন্দর্য।
বিস্তৃত ইলমের অধিকারী, সম্মানিত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত এবং গুরুদায়িত্বের ভার বহন
করেও তাঁর আচরণে নেই আত্মপ্রদর্শনের আভাস, ব্যবহারে নেই দূরত্বের দেয়াল, জীবনযাপনে
নেই কৃত্রিমতার ছাপ। মর্যাদা তাঁকে মানুষের ঊর্ধ্বে তুলে ধরেনি; বরং আরও আপন করে
তুলেছে। ইলম তাঁকে ভারী করেনি; দিয়েছে প্রশান্তি। দায়িত্ব তাঁকে কঠোর করেনি;
শিখিয়েছে সংযম ও জবাবদিহি।
তাঁর সরলতা বাহ্যিক অনাড়ম্বরতার নাম নয়; এটি অন্তরের এক নির্মল অবস্থার স্বাভাবিক
বহিঃপ্রকাশ। তাঁর সান্নিধ্যে তাই গাম্ভীর্য ও আন্তরিকতা, হায়বত ও আপনত্ব, নীরবতা ও
স্বস্তি—অদ্ভুত এক ভারসাম্যে পাশাপাশি থাকে। তাঁর কথা সংযত, অথচ হৃদয়গ্রাহী;
নীরবতা গভীর, অথচ অস্বস্তিকর নয়; মর্যাদা উচ্চ, অথচ মানুষের জন্য কোনো অদৃশ্য
প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায় না।
সম্ভবত এখানেই তাঁর ব্যক্তিত্বের এক বিশেষ সৌন্দর্য নিহিত—তিনি বড় হয়ে বড়ত্ব
দেখান না। তাঁর উপস্থিতি কোনো পরিচয় ঘোষণার অপেক্ষা রাখে না; আচরণই তাঁর পরিচয়
বহন করে। তাঁর ইলম কথা বলে তাঁর প্রজ্ঞায়, তাঁর মর্যাদা প্রকাশ পায় তাঁর বিনয়ে,
আর তাঁর অন্তরের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে মানুষের সঙ্গে তাঁর সহজ ও অকৃত্রিম ব্যবহারে।
মাহাত্ম্যের প্রকৃত সৌন্দর্য বোধ হয় এখানেই—মানুষ যত উচ্চতায় উঠবে, তত তার অন্তর
বিনয়ের দিকে নত হবে; যত বেশি জানবে, তত কম আত্মপ্রদর্শনের প্রয়োজন অনুভব করবে; যত
বড় দায়িত্ব পাবে, তত গভীর হবে আমানতবোধ।
তাই হযরত নোমানী সাহেবের সরলতা তাঁর মাহাত্ম্যের কোনো পার্শ্ব-অলঙ্কার নয়; এ যেন
তাঁর মাহাত্ম্যেরই সবচেয়ে নির্মল প্রকাশ। এমন মাহাত্ম্য উচ্চকণ্ঠ নয়, অথচ গভীর;
প্রদর্শনমুখর নয়, অথচ দীপ্ত; দূরত্ব সৃষ্টি করে না, বরং মানুষের হৃদয়ে আপন স্থান
করে নেয়।
৯. সরলতার সান্নিধ্যে পূর্বসূরিদের সুবাস
কোনো কোনো মানুষকে চিনতে দীর্ঘ পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না; অল্প কিছু সময়ের
সান্নিধ্যই তাঁর ব্যক্তিত্বের এমন জানালা খুলে দেয়, যা বহু কথাতেও উন্মোচিত হয়
না। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তবর্তী টেকনাফের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া টেকনাফ, কক্সবাজারের ৭৫ সালা দস্তারবন্দী
সম্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে হযরত মাওলানা মুফতী আবুল কাসেম নোমানী দামাত বারাকাতুহুম
বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় আগমন করেন। সাহেবজাদায়ে মুহতারাম হযরত মাওলানা মুফতী
আবু ওমাইর হাফিজাহুল্লাহসহ বিমানবন্দরে তাঁকে গ্রহণের পর ছাত্র, শিক্ষক ও
ভক্ত-অনুরক্তদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়। এরপর বিমানবন্দর থেকে টেকনাফের দীর্ঘ
পথ— যা বাহ্যত ছিল একটি সফর, তা স্মৃতিতে রয়ে গেল এক অনন্য সান্নিধ্যের অধ্যায়
হয়ে।
সেই অল্প সময়ের কাছাকাছি থাকা থেকেই তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি বিশেষ সৌন্দর্য
গভীরভাবে অনুভূত হয়েছিল। বিস্তৃত ইলম, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও গুরুদায়িত্ব—কোনোটিই তাঁর
স্বাভাবিক কথাবার্তাকে ভারী করেনি। কথায় ছিল সহজ আন্তরিকতা, ব্যবহারে অনায়াস
সৌজন্য, আর উপস্থিতিতে এমন এক মানবিক উষ্ণতা, যা পরিচয়ের আনুষ্ঠানিক দূরত্বকে
সহজেই ঘুচিয়ে দেয়।
সফরের পথ যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে—বড়ত্বের প্রকৃত সৌন্দর্য পদমর্যাদার
প্রকাশে নয়, স্বাভাবিকতায়। জ্ঞান যত গভীর হয়, আত্মপ্রদর্শনের প্রয়োজন তত কমে;
মর্যাদা যত উচ্চ হয়, বিনয়ের মূল্য তত বাড়ে। তাঁর চলন-বলনে এই সত্য কোনো বক্তব্য
ছাড়াই অনুভূত হচ্ছিল।
কিন্তু সেই সান্নিধ্যের তাৎপর্য কেবল একজন আলেমের সরল ব্যবহারে সীমাবদ্ধ ছিল না।
তাঁর পাশে বসে মনে হয়েছে, পূর্বসূরি মনীষীদের সেই চরিত্র-ঐতিহ্য এখনো পুরোপুরি
হারিয়ে যায়নি—যেখানে ইলমের সঙ্গে আদব, মর্যাদার সঙ্গে বিনয়, দায়িত্বের সঙ্গে
আল্লাহভীতি এবং নেতৃত্বের সঙ্গে খেদমত অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত ছিল। সময় বদলেছে,
প্রজন্ম বদলেছে; কিন্তু সেই উত্তরাধিকারের কিছু সুবাস এখনো কিছু মানুষের চরিত্রে
টিকে আছে।
হযরত নোমানী সাহেবের সান্নিধ্যে সেই সুবাস বিশেষভাবে অনুভূত হয়েছিল। তাঁর কাছে ইলম
যেন আত্মপ্রকাশের উপায় নয়, আত্মসংযমের দায়িত্ব; মর্যাদা আত্মগৌরবের উপলক্ষ নয়,
জবাবদিহির কারণ; আর নেতৃত্ব মানুষের ওপর অবস্থান নেওয়ার নাম নয়, বরং মানুষের জন্য
নিজের কাঁধে আরও ভার তুলে নেওয়ার অঙ্গীকার।
এখানেই তাঁর সরলতা একটি ব্যক্তিগত গুণের সীমা ছাড়িয়ে একটি ইলমি ঐতিহ্যের ভাষা
হয়ে ওঠে। এমন ঐতিহ্য, যেখানে একজন আলেমের পরিচয় শুধু তাঁর কিতাব ও দরসের মধ্যে
সীমাবদ্ধ থাকে না; তাঁর বসা, চলা, কথা বলা, নীরব থাকা, মানুষের সঙ্গে আচরণ করা এবং
নিজের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতেও সেই পরিচয় প্রকাশ পায়।
তাই টেকনাফের সেই সফর আজ আর কেবল একটি ভ্রমণের স্মৃতি নয়; এটি চরিত্রের এক নীরব
পাঠ। সেখানে দেখা গিয়েছিল—ইলম মানুষকে ভারী না করে পরিণত করতে পারে, মর্যাদা
মানুষকে দূরে না সরিয়ে আরও আপন করে তুলতে পারে, আর দায়িত্ব মানুষকে উচ্চাসনে না
বসিয়ে আরও বিনয়ী করে তুলতে পারে।
সেই কয়েক ঘণ্টার সান্নিধ্য তাই সময়ের হিসাবে ক্ষণিক হলেও প্রভাবের হিসাবে
দীর্ঘস্থায়ী—যেন পূর্বসূরিদের বাগান থেকে ভেসে আসা এক অদৃশ্য সুবাস; চোখে দেখা
যায় না, অথচ হৃদয় তাকে চিনে নেয়।
১০. উস্তাদদের ছায়ায় তৃপ্ত এক তালিবে ইলম : ছাত্রজীবনের এক অনুপম দৃষ্টান্ত
মানুষের প্রকৃত পরিচয় অনেক সময় তার বড় অর্জনে নয়, বরং এমন কোনো মুহূর্তে প্রকাশ
পায়—যখন তার সামনে এসে দাঁড়ায় প্রশংসা, প্রাপ্তি কিংবা নতুন সম্ভাবনার হাতছানি।
ছাত্রজীবনের তেমনই এক স্মরণীয় ঘটনা হযরত মুফতী আবুল কাসেম নোমানী দামাত
বারাকাতুহুমের মেধা, অসাধারণ স্মরণশক্তি এবং উস্তাদদের প্রতি গভীর আনুগত্যের এক
অনন্য পরিচয় বহন করে। ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট আলেম, বসুন্ধরা
ইসলামিক রিসার্চ সেন্টারের সম্মানিত মুহতামিম, তানযীমূল মাদারিসিদদীনিইয়াহ
বাংলাদেশের মান্যবর চেয়ারম্যান, খলিফায়ে হারদুয়ী শায়খুল হাদীস আল্লামা মুফতী
আরশাদ রহমানী দামাত বারাকাতুহুম।
দারুল উলুম দেওবন্দে অধ্যয়নকালে সৌদি আরব থেকে আগত এক প্রসিদ্ধ আলিমে দ্বীন প্রায়
এক ঘণ্টা আরবি ভাষায় বক্তব্য প্রদান করেন। বক্তব্য শেষে তিনি ছাত্রদের উদ্দেশে
প্রশ্ন করলেন—কে তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যটি আরবি ভাষায় পুনরায় উপস্থাপন করতে পারবে?
মজলিসে নেমে এল এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর তরুণ আবুল কাসেম নোমানী সাহেব উঠে
দাঁড়ালেন। গভীর মনোযোগে শ্রুত বক্তব্যের বিষয়বস্তু তিনি ধারাবাহিকভাবে আরবি
ভাষায় পুনরায় তুলে ধরতে লাগলেন। বক্তব্যের মূল বিষয়, বিন্যাস ও অর্থ তাঁর
স্মৃতিতে এমন স্বচ্ছতায় সংরক্ষিত ছিল যে, উপস্থিতদের বিস্ময়ের কারণ হয়ে দাঁড়াল
তাঁর অসাধারণ স্মরণশক্তি ও ভাষাগত দক্ষতা।
অতিথি তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে সৌদি রিয়ালের একটি বান্ডেল পুরস্কার হিসেবে তাঁর
হাতে তুলে দিতে চাইলেন। কিন্তু তরুণ ছাত্রটি বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করে
বললেন—তাঁর প্রয়োজনীয় ব্যয় ও আহারের ব্যবস্থা তাঁর পিতা করে দেন; অতএব অতিরিক্ত
অর্থের তাঁর প্রয়োজন নেই।
এই উত্তরেই প্রতিভার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আরেকটি গুণ প্রকাশ পেল—কানায়াত ও
নির্মোহতা।
অতিথির বিস্ময় এবার আরও গভীর হলো। তিনি তাঁকে সৌদি আরবের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে
বৃত্তির মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব রাখলেন। একটি নতুন সম্ভাবনার
দরজা তাঁর সা
আমাদের ডেস্ক : : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ৪৮ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে কক্সবাজারের পেকুয়ায় র্যালী প...বিস্তারিত
অনলাইন ডেস্ক: : সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, ভুয়া তথ্য শনাক্তকরণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারে সাংবা...বিস্তারিত
অনলাইন ডেস্ক: : লঘুচাপের প্রভাবে চট্টগ্রামসহ দেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে...বিস্তারিত
ইমরান নূর: কোঅর্ডিনেটর : নিজস্ব প্রতিবেদক: পর্যটন নগরী কক্সবাজারে চলচ্চিত্রচর্চা ও সুস্থ সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত ...বিস্তারিত
ইমরান নূর: কোঅর্ডিনেটর : আয়াছ রনি: কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের বড়ডেইল মৌজায় ১ দশমিক ৬৩০২ একর জমি নিয়...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : কক্সবাজার জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ মাওলানা নূর আহমদ আনোয়ারী বলেছেন, মানবতার মহান শিক্ষক ও র...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Coxsbazar | Developed By Muktodhara Technology Limited