শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৮:১০ পিএম, ২০২৬-১০-২৬
মহেশখালী প্রতিনিধি: ওয়াজেদুল হক মণি
কক্সবাজারের মহেশখালীতে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় দ্বীপবাসীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত টমটম, মিশুক ও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় অন্তত ৯টি মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছে পাঁচ বছরের কম বয়সী একাধিক শিশু ও তরুণ-যুবক। এসব দুর্ঘটনা সড়ক নিরাপত্তা, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং চালক ও পথচারীদের সচেতনতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সর্বশেষ শনিবার (২৫ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে বড় মহেশখালীর ফকিরাঘোনা মিয়াজির পাড়া বটতলা এলাকায় ডেকোরেশনের ট্রলি গাড়ি উল্টে চাকার নিচে পড়ে আনোয়ার হোসেন (২৫) নামে এক চালকের মৃত্যু হয়েছে। নিহত আনোয়ার বড় মহেশখালীর মুন্সীর ডেইল এলাকার মৃত তজু মিয়ার ছেলে। তিনি বড় মহেশখালীর 'বুশরা ডেকোরেশন' দোকানে প্রায় দেড় বছর ধরে কাজ করতেন। জানা গেছে, মাত্র ৯ মাস আগে তিনি বিয়ে করেছেন, এখনো কোনো সন্তান হয়নি।
এছাড়াও (২৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় উপজেলার মাতারবাড়ী ইউনিয়নের মগডেইল বাজার রাস্তার মাথায় টমটম গাড়ির চাপায় সোহাইবা নামে চার বছর বয়সী এক কন্যাশিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
এ ঘটনায় স্থানীয়রা টমটমচালককে আটক করে গাড়িটি জব্দ করার পর পুলিশকে খবর দেন।
নিহত সোহাইবা মাতারবাড়ী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ মাইজপাড়া এলাকার মাওলানা সাইফুল ইসলামের মেয়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে মা ও মেয়ে একটি টমটমে করে বাড়ি ফিরছিল। বাড়ির পাশের সড়কে পৌঁছে গাড়ি থেকে নামার সময় দ্রুতগতিতে আসা অন্য একটি টমটম শিশুটিকে চাপা দেয়। এতে শিশুটি গুরুতরভাবে আহত হয় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে গত ২০ অক্টোবর উপজেলার আদিনাথ জেটিঘাট এলাকায় ব্যাটারিচালিত যানবাহনের ধাক্কায় আফরিন সুলতানা নামে এক শিশু পর্যটকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা আরেক শিশু আইয়ান আহত হয়। নরসিংদী থেকে পরিবারের সঙ্গে মহেশখালী বেড়াতে এসে দুর্ঘটনার শিকার হয় শিশুটি। ঘটনাটি পর্যটনকেন্দ্র ও জেটিঘাট এলাকায় যান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এর আগেও ১৬ অক্টোবর সড়ক দুর্ঘটনায় ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ নলবিলা এলাকায় সড়ক পার হওয়ার সময় মিশুকের ধাক্কায় পাঁচ বছর বয়সী মোহাম্মদ জোবাইর নিহত হয়। দ্রুতগতির মিশুকের ধাক্কায় গুরুতর আহত শিশুটিকে উদ্ধার করার আগেই তার মৃত্যু হয়।
২২ সেপ্টেম্বর বড় মহেশখালী ইউনিয়নের জাগিরাঘোনা এলাকার সমবায় সমিতি সড়কে টমটম ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে মোহাম্মদ ফয়সাল নামে এক প্রবাসী যুবক নিহত হন। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হন। চকরিয়ার কৈয়ারবিল এলাকার বাসিন্দা ফয়সাল মহেশখালীতে বেড়াতে এসে দুর্ঘটনার শিকার হন।
চলতি বছরের ১২ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে মিজ্জিরপাড়া এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন খোন্দকারপাড়ার ফরহাদ। নিহত ফরহাদ কুতুবজোম ইউনিয়নের দক্ষিণ খোন্দকারপাড়ার নিবাসী নুরুল হাসেমের পুত্র।
এ ছাড়া গত ১৮ মে বড় মহেশখালীর মধুয়ারডেইল এলাকায় মোটরসাইকেল ও মিশুকের মুখোমুখি সংঘর্ষে শাকের উল্লাহ নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
বছরের শুরুতেও একই ধরনের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় একটি শিশু। গত ১৮ মার্চ সকাল ৯টার দিকে উপজেলার কালারমারছড়া ইউনিয়নের চিকনিপাড়া এলাকায় বেপরোয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশার চাপায় আয়েশা সিদ্দিকা (৬) নামের এক কন্যা শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনায় এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ঘটনাস্থলেই শিশুটির একটি পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিহত আয়েশা ওই এলাকার দিনমজুর নুরুল হকের মেয়ে। স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সকালে বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে বাজারে যাচ্ছিল শিশুটি। এ সময় একটি বেপরোয়া গতির সিএনজি তাকে ধাক্কা দিলে সে রাস্তায় ছিটকে পড়ে। পরে তার একটি পা সিএনজির চাকায় পিষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হয়। স্থানীয়রা তৎক্ষণাৎ তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
গত ১২ জানুয়ারি শাপলাপুর-ছোট মহেশখালী সড়কে টমটমের ধাক্কায় পাঁচ বছর বয়সী মিনহা মনি গুরুতর আহত হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
মহেশখালী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আবুল বশর পারভেজ বলেন, মহেশখালীতে একের পর এক এসব দুর্ঘটনায় উপজেলার সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মহেশখালীর বিভিন্ন সড়কে মোটরসাইকেল, টমটম, মিশুক, মাহিন্দ্রা ও পিকআপসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচল করে। বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জেটিঘাট, জনবহুল এলাকা এবং সড়কের মোড়ে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ ও পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা জরুরি। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যকর নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন হলেও দুর্ঘটনার পর উদ্ধার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনা ঘটার আগেই প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ তেমন চোখে পড়েনি।
সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন বলেন, মহেশখালী আদিনাথ জেটিতে টমটমের ধাক্কায় নরসিংদী থেকে মা-বাবার সাথে ঘুরতে আসা পাঁচ বছরের এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। প্রায় সময়ই এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর পাই। কত মা-বাবার বুক খালি হচ্ছে, যারা সন্তান হারাচ্ছে, তাদের পরিবারের কথা কি আমরা একবারও চিন্তা করেছি? এ ধরনের দুর্ঘটনা বন্ধ করার জন্য কোনো ব্যবস্থা বা উদ্যোগ কি আমরা নিয়েছি? মহেশখালীর মিশুক, টমটম চালকদের বেসিক ট্রেনিং এবং তাদের লাইসেন্সের আওতায় আনা প্রয়োজন। আমি উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালীন প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সাথে সমন্বয় করে তাদের ট্রেনিং এবং লাইসেন্সের আওতায় আনার একটা পদক্ষেপ নিয়েছিলাম, কিন্তু দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ায় করতে পারিনি। সেই সাথে সামনের বিপদজনক বাম্পারগুলো খুলে ফেলার একটা উদ্যোগ নিয়েছিলাম, তাও সম্ভব হয়নি। বর্তমান প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান রাখবো, তাদেরকে দ্রুত ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হোক, লাইসেন্সের আওতায় আনা হোক এবং বাম্পারগুলো খুলে ফেলার ব্যবস্থা করা হোক।
এ বিষয়ে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম যানবাহন চলাচলে কয়েকটি নির্দেশনা জারি করেছেন। নির্দেশনায় বলা হয়েছে উপজেলায় চলাচলকারী সকল টমটম ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার ডান পাশে স্থায়ী হাতল লাগাতে হবে, যাতে ডান পাশ দিয়ে কোনো যাত্রী উঠানামা করতে না পারেন। প্রত্যেক টমটম ও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চালকের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা জন্মনিবন্ধন সনদের কপি সার্বক্ষণিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। যানবাহনে কোনো ধরনের মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট বা বাদ্যযন্ত্র রাখা যাবে না, যাতে চালকের মনোযোগ বিঘ্নিত না হয়। চালকের বাম পাশে সর্বোচ্চ একজন যাত্রী বসতে পারবেন, চালকের ডান পাশে কোনো যাত্রী বসতে পারবেন না। মিশুক গাড়িতে তিনজনের বেশি যাত্রী বহন করা যাবে না এবং কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি টমটম, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মিশুকসহ কোনো যানবাহন চালাতে পারবে না। এ বিষয়ে যানবাহন মালিকগণকেও সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। উল্লিখিত নির্দেশনাসমূহ যথাযথভাবে প্রতিপালন নিশ্চিত করতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন সকল চালক, যানবাহন মালিক, পরিবহন সংগঠন, যাত্রীসাধারণ ও গণমাধ্যমকর্মীদের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছেন।
সচেতন মহল দাবি করছেন, নিয়মিত প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। পাশাপাশি পরিকল্পিত সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রম, নিয়মিত সচেতনতা ক্যাম্পেইন এবং ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে দ্বীপবাসী।
আমাদের ডেস্ক : : কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার শাপলাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বহিরাগত শেফায়ত ইসলাম নয়নের বিরুদ্ধে অফà¦...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার পহরচাঁদা ইউনিয়নে মাতামুহুরী নদীর ওপর নবনির্মিত রেল সেতুর বিকল্প পথেà¦...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : আগামী ১ নভেম্বর পর্যটকদের জন্য খুলছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। ২০২৭ সালের ১৫ মার্...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার আদিনাথ জেটি এলাকায় ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার (মিশুক) ধাক্কায় এক শি...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : বান্দরবানের লামা উপজেলার ৩ নম্বর ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ইয়াংছার মুখ এলাকা থেকে তিন কিশোরী নিখোঁজ হ...বিস্তারিত
আমাদের ডেস্ক : : আসন্ন প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য সরকারি উদ্...বিস্তারিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০১৯ - © 2026 Dainik Amader Coxsbazar | Developed By Muktodhara Technology Limited